নিজস্ব প্রতিনিধিঃ এই আসিফ সেই আসিফ। ছাত্র নেতৃত্বের উত্থান থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ, তারপর একের পর এক বিতর্ক সব মিলিয়ে তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার মতো আলোড়ন তৈরি হয়েছে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে ঘিরে।
অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে আন্দোলনের সামনের সারির মুখ হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। বয়স তখন পঁচিশের কাছাকাছি। দেখলে মনে হয় দেশের আর দশটা বেকার তরুণের মতোই এক ছাত্র। আর সেই চেহারার সঙ্গেই আসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যা তিনি নিজের পছন্দে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে বদলে নেন।
শপথ নেওয়ার পর প্রথম ধাক্কা আসে বিদেশি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তার দুর্বল ইংরেজি নিয়ে। সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে ন্যূনতম ভাষাজ্ঞান না থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়েও।
এরপর ষোলো মাসের দায়িত্বে নানা অভিযোগ জমে ওঠে। দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি এসব অভিযোগ এতটাই ঘন হয়ে ওঠে যে, পদত্যাগের পর তার পুরোনো দপ্তর নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন কয়েকজন উপদেষ্টা। শেষ পর্যন্ত শিল্প ও গণপূর্ত দপ্তরের দায়িত্বে থাকা আদিলুর রহমানের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়।
তদবির, চাঁদাবাজি, লাইসেন্স বাতিল বিতর্কের তালিকা
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের ভাষায়, ছাত্র প্রতিনিধি দুজনের প্রতি প্রত্যাশা অনেক ছিল, কিন্তু সেই মান ধরে রাখতে পারেননি তারা। অভিযোগ এসেছে তাদের মন্ত্রণালয়ের কাজেও, ব্যক্তিগত আচরণেও।
এত অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি ঘটনা হলো:
১. উত্তরবঙ্গ সফরে ২৮ বার হেলিকপ্টার ব্যবহার
বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসে কেবল ছয় দিনে রাষ্ট্রীয় অর্থে ২৮ বার হেলিকপ্টার ভ্রমণ। সরকারকে এ নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়।
২. বাবার ঠিকাদারি লাইসেন্স বাতিল
নিজের বাবার ঠিকাদারি নিয়ে বিতর্ক কিছুদিন প্রকট হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তিনি লাইসেন্স বাতিল করে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষমা চান।
৩. এপিএসের বিরুদ্ধে তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ
ঘনিষ্ঠ সহকারী মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে কয়েকশ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
৪. বিমানবন্দরে গুলিভর্তি ম্যাগাজিন উদ্ধার
ওআইসি যুব ক্যাপিটালের জন্য মরক্কো যাওয়ার পথে তার হাতব্যাগে ম্যাগাজিন পাওয়ার ঘটনা নতুন করে হৈচৈ তোলে। পরে দাবি করেন, ভুলে ব্যাগে রয়ে গিয়েছিল।
৫. গুলশানের চাঁদাবাজির ঘটনায় নাম ওঠা
ঘনিষ্ঠ ছাত্রনেতা জানে আলম অপু গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার জবানবন্দিতে উঠে আসে আসিফের সম্পৃক্ততার কথা।
৬. সংখ্যালঘু শিক্ষিকা নির্যাতনের ঘটনায় পরিবারের নাম
স্কুলশিক্ষক বাবা বিল্লাল হোসাইনের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু শিক্ষিকাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। শিক্ষিকার দাবি, ২০১৪ সালে বিল্লালকে বহিষ্কারের প্রতিশোধ হিসেবে ঘটনা ঘটে। অভিযোগে আসিফের নামও আসে।
৭. ক্রিকেট বোর্ডে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
বিসিবির কাউন্সিলর নিয়োগে নিজের প্রভাব খাটিয়ে পরিচালক নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও ওঠে।
উন্নয়নের ফিরিস্তি বনাম জবাবদিহির শূন্যতা
পদত্যাগের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা হিসেবে নানা উন্নয়ন কাজ তুলে ধরেন আসিফ। ২৩টি প্রকল্প অনুমোদন, এলজিইডি–তে সড়ক উন্নয়ন, ৩১টি প্রকল্পে ব্যয় সাশ্রয়, ই–রিকশা পাইলটিং, তিস্তা সেতু, পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্প এভাবে সাফল্য দেখান তিনি।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায় অন্য জায়গায়। দুর্নীতি প্রতিরোধে কী করেছেন তিনি? কাজের মান উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন? প্রকল্প বাছাইয়ে স্বচ্ছতা কতটা ছিল? এসব প্রশ্ন তার রিপোর্টে অনুপস্থিত।
অন্যদিকে তার মেয়াদে নেওয়া কিছু প্রকল্প নিয়েই বিতর্ক উসকে দেয় আরও আলোচনাকে। যেমন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরকে না জানিয়ে জেলা পরিষদের মাধ্যমে পাঠাগার নির্মাণ, ওসমানী উদ্যানে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরিতে পরিবেশবাদীদের আপত্তি, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৩৪৬ কোটি টাকার প্রশিক্ষণ প্রকল্প।
